বঙ্গবন্ধুর সরকার পরিচালনা ১৯৭২-১৯৭৫।
একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন, বাংলাদেশে বসবাসকারী অনেকে দেখেছেন বহুদিন। অতীতে অনেকে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছেন, যদিও তারা বাঙালি ছিলেন না। গত শতকের গত ৪০ বছরেও অনেকে সে-ভূখণ্ডের কথা বলেছেন, ভারত ভাগ হওয়ার সময় সে-পরিকল্পনাও একবার হয়েছিল।
গত শতকের ষাটের দশকে মওলানা ভাসানীও বাঙালিদের জন্য স্বাধীন ভূখণ্ডের কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্নের রূপ পেয়েছিল একেবারে একজন খাঁটি বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। তিনিই পেরেছিলেন বাঙালিদের জন্য নির্মাণ করে দিতে একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্রের সীমানা। বঙ্গবন্ধু বলি, জাতির জনক বলি বা শেখ মুজিব বলি– যে নামেই সম্বোধন করি না কেন, বাংলাদেশের কথা বললেই ভেসে ওঠে তার অবয়ব এবং সে-কারণেই তার স্থান নির্দিষ্ট হয়ে গেছে ইতিহাসে এবং সে-কারণেই আমরা তাকে স্মরণ করি বারবার।
১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির পত্তন হয়েছিল এবং তা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে। সম্প্রতি অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ‘রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্তভাবে তা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, “অসহযোগ আন্দোলনের সময় যে ৩৫টি নির্দেশ শেখ মুজিব জারি করেন তা কর্তৃত্ব প্রতিরোধ এবং অস্বীকার করার মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতা এবং বিপরীত জনমুখী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে বাঙালির জনসাধারণের সঙ্গে প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতার ভিত্তি করে করে।…
বাঙালি জনসাধারণ একটি স্বতন্ত্র, বিকল্প, স্বাধীন রাষ্ট্রের বাসিন্দা হওয়ার বোধ যুদ্ধের পূর্ব থেকেই বুকের মধ্যে, হৃদয়ের মধ্যে, বুদ্ধির মধ্যে লালন করতে থাকে।”
একটি দেশ সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এ-কথা ইতিহাসে থেকে যাবে কেউ এই সত্য অস্বীকার করতে চাইলেও। এর কৃতিত্ব আর কোনো রাজনৈতিক দলের নেই।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদ ও আওয়ামী নেতৃত্বে সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয়; বলা যেতে পারে জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে। দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু এমন একটি দেশ পেয়েছিলেন যেখানে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, ৫ লাখেরও বেশি নারী নির্যাতিত হয়েছেন, আহত অগণিত। রাস্তাঘাট, স্কুল সব কিছু প্রায় ধ্বংস, ছিল খাদ্য সংকটও। সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু যা করেছিলেন তা বিস্ময়কর। মাত্র ৯ মাসে সংবিধান দিয়েছিলেন একটি জাতিকে। যেখানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মূলনীতি করা হয়েছিল এবং যুদ্ধাপরাধ বিচারের ধারাও সংযোজিত হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল। আজকের বাংলাদেশের ভিত্তি তিনিই করেছিলেন।
আজ বাংলাদেশে যত প্রতিষ্ঠান কার্যকর দেখছি এবং অনেক আইন ও পুনর্বাসন প্রকল্প বঙ্গবন্ধু সরকারই গ্রহণ করেছিল। আমরা সেগুলো বেমালুম ভুলে গেছি। একদিক শূন্য থেকে দেশ গড়া, আন্তর্জাতিক চাপ, মানুষের মহাপ্রত্যাশা– সব মিলে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল। কিন্তু তার মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি গড়া হয়েছিল। আমি এখানে তার ৮৫টির তালিকা দিচ্ছি–
বঙ্গবন্ধুর সরকার আমলে গৃহীত পদক্ষেপ:
০১. অস্থায়ী শাসনতন্ত্র আদেশ জারি, ১১ জানুয়ারি ১৯৭২, বাংলা ২৭ পৌষ ১৩৭৮
০২. আদমজী জুট মিল উদ্বোধন, ১৯৭২, দৈনিক আজাদ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২
০৩. আমদানি নীতি ঘোষণা, ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল
০৪. ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠন, ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট-১৯৭৫, পাস হয় ১৪ জুলাই ১৯৭৫
০৫. গণপরিষদ অধিবেশন জারি, ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল
০৬. গণপরিষদ আদেশ জারি, ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ
০৭. চতুর্থ সংশোধনী, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫
০৮. জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ গঠন, ২৫ জানুয়ারি ১৯৭২
০৯. জাতীয় পতাকা চূড়ান্তকরণ, ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি
১০. জাতীয় রক্ষীবাহিনী, ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ
১১. জাতীয় সংগীত চূড়ান্তকরণ, ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২
১২. জাতীয়করণ, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ
১৩. তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন, ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর
১৪. তৃতীয় সংশোধনী, ২৮ নভেম্বর ১৯৭৪
১৫. বাকশাল, ১৯৭৫ সালের ৬ জুন
১৬. দ্বিতীয় সংশোধনী, ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩
১৭. নির্বাচন কমিশন আদেশ জারি, ২৩ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রদত্ত এবং সরকারি হ্যান্ড আউটে
১৮. ন্যাশনাল ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন প্রদানের নির্দেশ, ১২ জানুয়ারি ১৯৭৩
১৯. পরিত্যক্ত সম্পত্তি প্রসঙ্গ, ১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশবলে
২০. পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩টি জেলায় বিভক্ত ১৯৭৫, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৮ জানুয়ারি ১৯৭৫
২১. প্রথম জাতীয় শোক দিবস, ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২
২২. প্রথম বাংলায় গেজেট প্রকাশ, ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২
২৩. প্রথম বাজেট, ১৯৭৩ সালের ২ জুন
২৪. বাংলাদেশ সরকার (চাকরি) আদেশ ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ৯নং আদেশ, ১৯৭২)
২৫. বাংলাদেশ সরকার (চাকরি বাছাই) আদেশ, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ৬৭নং আদেশ, ১৯৭২)
২৬. বাংলাদেশ সরকার (চাকরি বাছাই (সংশোধনী) আদেশ, ১৯৭২ (রাষ্ট্রপতির ৯২নং আদেশ, ১৯৭২)
২৭. প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস্ অর্ডিন্যান্স বাতিল, ২৮ আগস্ট ১৯৭৩
২৮. বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক, ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২
২৯. বাংলাদেশ ইন্সুরেন্স একাডেমি, ১৯৭৩
৩০. বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ, ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ ৩২-এর মাধ্যমে
৩১. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ২৭নং আদেশবলে ১৯৭৩ সালে
৩২. বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশন, ১৭ এপ্রিল ১৯৭২
৩৩. বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ, ১৯৭২, ২৪.০১.১৯৭২
৩৪. বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, ১৯৭৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি
৩৫. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে
৩৬. বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, মুজিবনগর সরকার ১৯৭১ সালের ৮ অক্টোবর
৩৭. বাংলাদেশ ব্যাংক (জাতীয়করণ) আদেশ পাস, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২৬, ১৯৭২)
৩৮. বাংলাদেশ ভূমি মালিকানা (সীমিতকরণ) আদেশ ১৯৭২, রাষ্ট্রপতির ৯৮নং আদেশবলে
৩৯. বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, ১৯৭৪ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লায়
৪০. বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি
৪১. বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ১২৯নং আদেশবলে
৪২. বাংলাদে
