৯ ই আগষ্ট "একাত্তরের এই দিনে"

 প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট ২০২০, ১০:৪৮ অপরাহ্ন   |   জাতীয়


খোরশেদা মল্লিক ডলি


 শ্রাবণের মেঘামেঘাচ্ছন্ন রাএি,গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে,মৌসুমি হাওয়ায় শন শন শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে ঝিঁ ঝিঁ পোকা আপন মনে সুর সাধছে।  মাঝে মাঝে একটি জোনাকি পোকা নিভু নিভু আলো জ্বালিয়ে আপন গতিতে চলছে। নিরব নিস্তব্ধ পৃথিবী।  ঘরির কাঁটা টিক টিক করতে করতে রাত্রি ১২ টা ব্যাতিক্রম করতেই তারিখ পরিবর্তন হয়ে নতুন তারিখ এর শুভ  সূচনা।  ৯ই আগস্ট,১৯৭১।  নিস্তব্ধ নিঝুম পরিবেশে ২৩ খানা নৌকা কদমপুর পাথারের মাঝখানে বটগাছের প্রান্তে এসে নোঙ্গর করল। নৌকায় বাংলা মায়ের দামাল ছেলের দল, মুক্তিপাগল মুক্তি যোদ্ধারা।নৌকার শব্দের পাশের পাটখেত ও ধানক্ষেত হতে বাবুই পাখির দল একত্রে ঝাঁক বেঁধে উরে গেল।  তারা যেন করতালি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমনকে স্বাগত জানাল। মুক্তিযোদ্ধাদের একত্র হওয়ার উদ্দেশ্যে মুকসুদপুর থানা অপারেশন।  অপারেশন নেতৃত্ব দিচ্ছে জাফর আহমেদ মল্লিক,কোহিনুর মোল্লা ও ওয়াজেদ মোল্লা। সঙ্গে রয়েছে ১৭২জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।  সকলে ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত  নেয়া হলো মুক্তিবাহীনি থানা অধিনায়ক জাফর আহমেদ মল্লিক মুকসুদপুর রনাঙ্গনের সার্বিক দিক পরিচালনা  করবেন।  অধিনায়ক জাফর কালবিলম্ব না করে একটি খড়িমাটি দিয়ে নৌকার পাটাতনের উপর অপারেশনের নীল- নকশা তৈরী করল এবং সকলকে আক্রমণের দিক -নিদের্শনা বুঝিয়ে দিল।

অপারেশন উদ্দেশ্য রাত্রি  ১টা ১৫ মিনিটে যাত্রা শুরুর পূর্ব মুহুর্তে  একে অপরের সঙ্গে আলিঙ্গন করছে।  হঠাৎ বট গাছ হতে শালিকের ঝাঁক কিচির -মিচির করে উঠল।  যেন প্রকৃতির ইশারায় মঙ্গলসূচক উলুধ্বনি দিয়ে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের যাত্রা শুভ হোক সেই প্রার্থনা জানাল।  রনাঙ্গনের অধিনায়কের নির্দেশ মোতাবেক এসে নিজ নিজ পজিশনে অবস্থান নেয়।  থানায় আলো জ্বলছে। 

দেশের অবস্থা খারাপ।  তাই থানাকে সর্বদাই সজাগ থাকতে হচ্ছে।  জেলা সদর থেকে খবর আসছে। আবার থানা থেকেও জেলা সদরে খবর পাঠান হচ্ছে বেতার যন্ত্রে।  অধিনায়াক নির্দেশ মোতাবেক কোহিনুর তার গ্রুপ নিয়ে থানায় দক্ষিন-পশ্চিম কর্নারে এবং ওয়াজেদ মোল্লা থানায় পশ্চিমে রান্নাঘরের নিকটে অবস্থান নিলো।  এখন শুধু অধিনায়ক নির্দেশে অপেক্ষা।  ওদিকে ঈদগাহের নিকট দিয়ে থানায় পুকুর পাড়ের তালগাছের গোড়ায় মেশিনগান ফিক্সডলাইন করে শাহজানকে রেখে জাফর ক্রোলিং করে অগ্রসর হলো থানায় দিকে। অধিনায়ক সর্বপ্রথম গ্রেনেড নিক্ষেপ করবে থানায় মধ্যে।  কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটা সম্ভব হলো না।  কর্তব্যরত পুলিশ অফিসার এদিকে সেদিক টর্চলাইট মারতে থানায় কোহিনুর আমগাছের আড়ালে লুকিয়ে যায়।

হঠাৎ অমঙ্গলের  প্রতীক ভূতোম পেচাঁ ডাকতে ডাকতে বিপদের অশনি সংকেত জানিয়ে উড়ে গেল।  হঠাৎ কোহিনুর অবস্থান বেগতিক দেখে অধিনায়কের  নির্দেশ উপেক্ষা করে পুলিশ অফিসারকে লক্ষ্য করে এলএমজির ব্রাশ টেনে নেয়।  তখন জাফর কেবল থানায় গেটে পৌছেছে।  জাফর থানা বারান্দায় ফিরে যায়।  তখন রাত ৪:৩০ মিনিট।  শুরু হল গুলি বিনিময়।  কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা  পরিবেষ্ঠিত হয়ে যায় ফলে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

এদিকে ভোর হবার সাথে সাথে স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির আবদুল জব্বর মোল্লাসহ সকলের সার্বিক সহযোগিতায় ও স্থায়ীয় গ্রামবাসীরা মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ দেবার জন্যে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আসতে থাকতে তারা সাথে করে  নিয়ে আসে চিড়া, গুড়, মুড়িসহ ঢাল-সড়কি, রামদা ও বল্লম।  জনগনের আশ্চর্য ধরনের সহযোগিতা  দেখে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল আরো বেড়ে যায়। বিশেষ করে কমলাপুর, টেংরাখোলা,চন্ডীবর্দী লাখাইরচর, সুন্দরদীর কিশোর ছেলেদের উৎসাহ দেখে মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারলো স্বাধীনতা আমাদের দ্বারপ্রান্তে।একটানা ৮ ঘন্টা যুদ্ধের  পর অধিনায়ক জাফর সকল যোদ্ধাদের নিকট গিয়ে রণকৌশল পরিবর্বন করার জন্য সময় নির্ধারন করে দিয়ে নগরকান্দায় কমান্ডার আলতাফকে তার লোকজনসহ আসার সংবাদ পাঠায় এবং কমান্ডার আজিজ মোল্লা সাহেবের নিকট পত্র  লিখে গুলী সরবারহ করার জন্য। মোল্লা সাহেব সময়মত গুলী পাঠিয়ে দেয় এবং আলতাফ বিকেল ৩:২৫ মিনিটে দলবলসহ এসে পৌঁছায়। বিকেল ৪টা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুনভাবে ত্রিমুখী আক্রমন শুরু করা হয়। আলতাফ ও কোহিনুরকে এলএমজি ফিক্সডলাইন করে  দিয়ে অধিনায়ক জাফর একটি চাইনিজ রাইফেল ও ৪ টি গ্রেনেড নিয়ে থানায় পেছন দিয়ে ঝটিকা আক্রমণ চালায়। ছাদে  দুটি গ্রেনেড এবং থানায় ভিতরে  দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে থানায় ওসির রুমে ঢুকে পড়ে। ওসি ইয়াকুব জাফরকে ফায়ার করার জন্য রিভলবার তাক করে।  কিন্তু সে ত্বরিতগতিতে ওসিকে রাইফেলের বাঁটের আঘাতে শক্তিহীন করে ফেলে। অন্যদিকে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী সকলে ফায়ার করতে করতে এগিয়ে আসে।  অবস্থা বেগতিক দেশে রাজাকাররা ছাদ হতে রাইফেল ফেলে দিয়ে হাত উঁচু করে নেমে আসতে শুরু করল এবং পুলিশ হাতিয়ার ফেলে পালাতে লাগল। থানা হতে যে সকল রাজাকার ও পুলিশ পালিয়ে যাচ্ছিল কিশোর ছেলেরা তাদের      ধরে আনন্দ উল্লাসের সাথে প্রহর করতে থাকে এবং কখন যে তাদের প্রাণ পাখি উড়ে  গেছে কিশোরদের খেয়ালই নেই। তারা শুধু উল্লাস করতে করতে জয়বাংলার  শ্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুললো।

ওসি ইয়াকুব মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট হাত জোর করে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে গুলীর শব্দ। ওসি ইয়াকুব মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শত্রুমুক্ত হলো মুকসুদপুর থানা। বিজয় উল্লাসে উল্লাসিত জনতা শ্লোগান দিতে লাগল।  জয়বাংলা, মুক্তিযোদ্ধা জনতা গড়ে তোলে একতা শ্লোগান দিতে দিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ধরলো। তাদের উল্লাসিত চোখে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাংঙ্খা তাদের চেতনায় মুক্তির আবেগ,তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত আর বজ্রকন্ঠে স্বাধীন দেশের মানুষের তীব্র বাসনা ব্যক্ত হতে লাগল।মুক্তিযোদ্ধারা থানা আক্রমণ করে ৪২ টি রাইফেল , ১টি পিস্তল, ১টি বিভলবার, ৫টি বন্ধুক ও ৪ টি ব্যাটাগান দখল করে। রাজাকার ও পুলিশসহ সর্বমোট ৪৮ জন নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বারু আহত হয়।

জাতীয় এর আরও খবর: