ডিগ্রি আছে, কাজ নেই: শিক্ষিত বেকারত্বের দায় কার?

 প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন   |   জেলার খবর


মো:নাজমুল হাসান

শিক্ষার্থী সিটি ইউনিভার্সিটি


একজন তরুণ চার-পাঁচ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করলেন। পরিবারের প্রত্যাশা, নিজের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি সনদ হাতে বের হলেন। কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশ করেই বুঝতে পারলেন, ডিগ্রি অর্জন করাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল না; কঠিন কাজ হলো সেই ডিগ্রির উপযুক্ত একটি কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়া।


বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ আজ এই বাস্তবতার মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি?


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায় শিক্ষিত প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ বেকার ছিলেন। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ—যা শিক্ষার অন্যান্য স্তরের তুলনায় বেশি। এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করায়: উচ্চশিক্ষা কি তরুণদের কর্মজীবনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত করতে পারছে?


সমস্যার একটি বড় জায়গা হলো শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান কিংবা বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে বের হতে পারেন না। অন্যদিকে নিয়োগদাতারা অনেক সময় নতুন স্নাতকের কাছেও অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা করেন। ফলে অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি পাওয়া কঠিন, আবার চাকরি ছাড়া অভিজ্ঞতা অর্জনও কঠিন—তরুণেরা যেন এক বৃত্তের মধ্যে আটকে যান।


এ সংকটের জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করাও ঠিক হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম কতটা সময়োপযোগী, ইন্টার্নশিপের সুযোগ কতটা বাস্তবভিত্তিক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।


আরেকটি বিষয় আমাদের ভাবতে হবে। চাকরি বলতে আমরা এখনো প্রধানত সরকারি চাকরি কিংবা নির্দিষ্ট কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের চাকরিকে বুঝি। ফলে উদ্যোক্তা হওয়া, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, কারিগরি পেশা কিংবা নতুন ধরনের সেবামূলক কাজকে অনেকেই বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব দিতে চান না। তবে এসব ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ, পুঁজি, বাজারসংযোগ এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। শুধু তরুণদের ‘উদ্যোক্তা হও’ বললেই সমস্যার সমাধান হবে না।


শিক্ষিত বেকারত্বের প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘদিন চাকরি না পেলে তরুণদের আত্মবিশ্বাস কমে, পরিবারে আর্থিক চাপ তৈরি হয় এবং সমাজে হতাশা বাড়ে। একজন শিক্ষিত তরুণ যখন নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না, তখন তাঁর অর্জিত শিক্ষা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহারও হয় না। এটি ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই ক্ষতি।


এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, যোগাযোগদক্ষতা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে হবে।


তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষিত বেকারত্বকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা। একজন শিক্ষার্থীকে নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে—এটি সত্য। কিন্তু রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতকেও এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সেই দক্ষতা কাজে লাগানোর বাস্তব সুযোগ থাকবে।


আমাদের তরুণেরা শুধু সনদ হাতে নিয়ে অপেক্ষা করতে চান না; তাঁরা কাজ করতে চান, নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চান এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চান। তাঁদের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান।


কারণ, একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কতজন স্নাতক তৈরি করল, শুধু তা দিয়ে উন্নয়ন মাপা যায় না। বরং সেই স্নাতকদের কতজন নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পেলেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

জেলার খবর এর আরও খবর: