৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের চোরাবালিতে ডুবছে দেশের প্রাণভোমরা গার্মেন্টস শিল্প

 প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন   |   অর্থ ও বাণিজ্য



বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ হলো তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাত। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই শিল্প আজ এক গভীর অস্তিত্বের সংকটে ধুঁকছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই খাতের মালিক ও শ্রমিকরা যে আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন, তা আজ নীতিগত মারপ্যাঁচ আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে।

প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি বনাম শূন্য হালের বাস্তবতা

শুরুতে যখন ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল অঙ্কের প্রণোদনা বা সহায়তার ঘোষণা আসে, তখন দেশের স্থবির ও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মালিকরা একটি বড় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। সবার মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, হয়তো এই অর্থের ছোঁয়ায় মৃতপ্রায় কারখানাগুলো আবার সচল হবে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে।

কিন্তু সেই আশার বেলুন ফুটতে সময় লাগেনি। প্রণোদনার সেই গল্প-স্বল্প আর বড় বড় ঘোষণার পর যখন মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন খুঁজতে যাওয়া হলো, তখনই শুরু হলো লুকোচুরি খেলা।

লিয়েন ব্যাংক আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যাঁড়াকল

কাগজ-কলমে ঘোষণা এক রকম, আর বাস্তবায়নের মারপ্যাঁচ সম্পূর্ণ অন্য রকম। বাংলাদেশ ব্যাংক একের পর এক সার্কুলার জারি করে দায় সারছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশ দিচ্ছে লিয়েন ব্যাংকগুলোকে—"আপনারা টাকা ছাড় করুন।"

আর ভুক্তভোগী উদ্যোক্তারা যখন আশা বুক বেঁধে লিয়েন ব্যাংকগুলোর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তখন ব্যাংকের সিন্দুক থেকে মিলছে কেবল একরাশ হতাশা। লিয়েন ব্যাংকগুলো সাফ জানিয়ে দিচ্ছে—"আমাদের কাছে তো কোনো টাকা নেই!" প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার যদি ব্যাংকগুলোর কাছে কেবল এক টুকরো কাগজই হয়ে থাকে, তবে সেই অদৃশ্য ৬০ হাজার কোটি টাকা আসলে কোথায় গেল? কার সিন্দুকে জমা হলো এই বিশাল অংকের অর্থ? সরকার ঘোষণা দিল একভাবে, আর মাঠপর্যায়ে ব্যাংকগুলো তা পুরোপুরি অস্বীকার করে বসল—তাহলে কি এই প্রণোদনা কেবলই কথার কথা ছিল?

ঋণ আদায়ের নামে নতুন নাটক: অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ভূত

পরিস্থিতি যখন আরও জটিল আকার ধারণ করেছে, তখন সমাধান না খুঁজে সরকারের তরফ থেকে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন আইনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও বন্ধ ফ্যাক্টরির দায়-দেনা উদ্ধারের জন্য এখন একটি নতুন থার্ড-পার্টি কোম্পানি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কোম্পানিগুলোর কাছে বন্ধ হওয়া বা সংকটে থাকা কারখানাগুলোর দায়দায়িত্ব ও অ্যাসেট বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেই কোম্পানি পরবর্তীতে নিজেদের মতো করে সেই সম্পত্তি বিক্রি বা জবরদস্তিমূলক উপায়ে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালাবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি তবে ভুল পথে হাঁটছেন? যে উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে বছরের পর বছর রক্ত-ঘাম ঝরিয়েছেন, তাঁদের সমস্যার মূল উৎপাটন না করে এমন বিদেশি বা করপোরেট আদলের কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া কি এই শিল্পের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার সমান নয়?

জাতির প্রশ্ন: নীতিনির্ধারকরা কি তবে দিশেহারা?

আজ প্রশ্ন উঠছে—সরকার কি তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছে? একদিকে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার কোনো বাস্তব সুফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না, অন্যদিকে একের পর এক অপরিপক্ব সার্কুলার ও আইন করে পুরো খাতটিকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

একটি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে এভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভুল নীতির গ্যাঁড়াকলে ফেলে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। সময় এসেছে এই প্রণোদনা নামক প্রহসনের শ্বেতপত্র প্রকাশ করার। ৬০ হাজার কোটি টাকা কোথায় বরাদ্দ হলো, কার পকেটে গেল এবং লিয়েন ব্যাংকগুলোর এই দেউলিয়াত্বের আসল রহস্য কী—তার পরিষ্কার জবাবদিহিতা আজ সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই খাত ধসে পড়লে তার অভিঘাত পুরো অর্থনীতিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেবে।

কাজী আবু বকর

ম্যানেজিং ডিরেক্টর

করোনা ফ্যাশন লিমিটেড, ঢাকা।

অর্থ ও বাণিজ্য এর আরও খবর: