সাদিয়ার জিপিএ-৫ অর্জনের প্রশংসায় দিনাজপুরের ডিসি রফিকুল
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
অর্থের অভাবে পড়াশোনা থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল সাদিয়া আফরিনের। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তার আশায় জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তার মা। কিন্তু শুধু অর্থ দিয়ে সহযোগিতা নয়, সাদিয়ার পড়াশোনার দায়িত্ব অনেকটা নিজের কাঁধে তুলে নেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. রফিকুল ইসলাম। তার নিয়মিত তদারকি, পড়াশোনার রুটিন ও অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সাদিয়া।
মো. রফিকুল ইসলাম সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার ধুবিল ইউনিয়নের মেহমানশাহী গ্রামের কৃতিসন্তান। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতি তার মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়ার বাসিন্দা সাদিয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সীমিত। তার বাবা মো. সেলিম চালকলের শ্রমিক এবং মা আরিফা বেগম সংসারের কাজের পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করেন। বাড়িতে নেই আলাদা পড়ার ঘর কিংবা পড়ার টেবিল। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে পড়তে হয়েছে সাদিয়াকে।
পরিবারের এই সংকটের কথা জানিয়ে সাদিয়ার মা জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তা চান। প্রথম সাক্ষাতেই সাদিয়ার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বুঝতে পারেন ডিসি রফিকুল ইসলাম। তিনি শুধু আর্থিক সহায়তা না দিয়ে সাদিয়াকে এক সপ্তাহের পড়া দিয়ে দেন এবং একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলার নির্দেশনা দেন।
রাতে দুই ঘণ্টা ও ভোরে দুই ঘণ্টা পড়াশোনা, রাত ১০টায় ঘুম এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠার রুটিন ঠিক করে দেন তিনি। পাশাপাশি বিকেলে খেলাধুলার সময় নির্ধারণ ও নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
এরপর প্রতি বুধবার গণশুনানির দিনে সাদিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে আগের সপ্তাহের পড়া বুঝিয়ে দিত। ডিসি রফিকুল ইসলাম তার পড়া শুনতেন, ভুলগুলো সংশোধন করে দিতেন এবং পরবর্তী সপ্তাহের পড়া ঠিক করে দিতেন। এভাবে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস, এক মাস থেকে এক বছর—চলতে থাকে সাদিয়ার পড়াশোনার এই বিশেষ যাত্রা। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হয়ে ওঠে তার আরেকটি পাঠশালা।
পড়াশোনার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে সাদিয়াকে ৭ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় সহায়তা ছিল জেলা প্রশাসকের নিয়মিত খোঁজখবর, উৎসাহ ও মানসিক সাহস জোগানো।
অবশেষে গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। কাদের বকস মেমোরিয়াল হাই স্কুল থেকে এবার ৪৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ২২ জন পাস করলেও একমাত্র সাদিয়াই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
সাদিয়ার মা আরিফা বেগম বলেন, “স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু অর্থ দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়া দিয়েছেন, পড়া নিয়েছেন এবং খোঁজখবর নিয়েছেন।”
সাদিয়া জানায়, প্রথম দিকে স্যারের কাছে পড়া দিতে ভয় লাগলেও নিয়মিত পড়াশোনা করার চেষ্টা করত সে। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জেলা প্রশাসকের দেওয়া সাহস তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলীও জেলা প্রশাসকের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তার ভাষ্য, জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন এবং তার পড়াশোনার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ নিতেন।
জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রথম দিন সাদিয়ার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলাম, মেয়েটির মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রয়েছে। তাই তাকে একটি চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছিল। সাদিয়া সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিয়মিত হোমওয়ার্ক করেছে এবং রুটিন মেনে পড়াশোনা করেছে।”
সাদিয়ার এই সাফল্য শুধু একটি জিপিএ-৫ অর্জনের গল্প নয়; এটি একজন দায়িত্বশীল প্রশাসকের মানবিক উদ্যোগ ও একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর অদম্য প্রচেষ্টার অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প। অর্থের পাশাপাশি সঠিক দিকনির্দেশনা, নিয়মিত তদারকি ও মানসিক সাহস যে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, সাদিয়ার সাফল্য তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার ধুবিল মেহমানশাহী গ্রামের সন্তান মো. রফিকুল ইসলামের এই উদ্যোগ তাই সাদিয়ার পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সাদিয়ার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া এবং অভাবের সংসারের হাল ধরা। জিপিএ-৫ অর্জনের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নপূরণের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল সে।
