ঢাকার রুগ্ণ শিল্প ও এসএমই বাঁচাতে চট্টগ্রামের পথ অনুসরণ জরুরি: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাঁচানোই হোক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি

 প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৯ অপরাহ্ন   |   সারাদেশ


সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের শিল্প খাত নিয়ে অত্যন্ত দূরদর্শী ও সময়োপযোগী একটি উদ্যোগের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তীব্র আর্থিক ও অবকাঠামোগত সংকটে পড়া বিজিএমইএ-র তালিকাভুক্ত ২১টি রুগ্ণ তৈরি পোশাক কারখানা পুনরায় চালু করার জন্য একটি অভিনব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি শিল্প-কারখানার অব্যবহৃত বা লিজকৃত জায়গায় ‘মাল্টি-ফ্যাক্টরি হাব’ গড়ে তুলে রুগ্ণ ও বন্ধ কারখানাগুলোকে সেখানে স্থানান্তরের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এই ধরনের সাহসী ও কার্যকর সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং শিল্প বাঁচাতে নতুন আশার আলো জ্বেলেছে।

চট্টগ্রামের এই মডেলটি যদি আমাদের রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকায় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ছোট ফ্যাক্টরি বা এসএমই (SME) খাতের সুরক্ষায় বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের পোশাক ও উৎপাদন খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তির বিষয় হবে।

আজকের দিনে ঢাকার মতো জনবহুল ও ব্যয়বহুল শহরে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা চরম চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাগামহীন ঘরভাড়া, কারখানার স্পেসের চড়া দাম, ইউটিলিটি সংকটের পাশাপাশি আধুনিক অবকাঠামোর অভাব—সব মিলিয়ে ঢাকার অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক সম্ভাবনাময় ছোট প্রতিষ্ঠান পুঁজির অভাবে ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশের অর্থনীতিতে, কর্মসংস্থানে এবং বড় কারখানার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে এই এসএমই ও ছোট ফ্যাক্টরিগুলোর অবদান অপরিসীম।

চট্টগ্রামের ওই উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি ঢাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও অনুরূপ পদক্ষেপ দেখতে পেতাম, তবে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে যেত। সরকারের অব্যবহৃত জমি, কিংবা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বেদখল বা অলস পড়ে থাকা বড় বড় জায়গায় যদি বিশেষ ‘এসএমই হাব’ বা ‘স্মল ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ তৈরি করা যেত, যেখানে স্বল্পমূল্যে বা সহজ শর্তে ছোট ফ্যাক্টরিগুলোকে স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হবে—তবে হাজার হাজার রুগ্ণ ও ধুঁকতে থাকা কারখানা নতুন জীবন পেত।

পাশাপাশি, এই ধরনের হাবগুলোতে যদি যৌথভাবে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (CETP), নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস এবং আধুনিক গুদামজাতকরণের সুবিধা রাখা যায়, তবে ছোট উদ্যোক্তাদের উৎপাদন খরচ এক লাফে অনেকখানি কমে আসবে। এটি একদিকে যেমন বন্ধ হতে বসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখবে, অন্যদিকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পে প্রবেশ করার পথ সুগম করবে।

একটি দেশ যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগোয়, তখন শুধু মেগা ইন্ডাস্ট্রি বা বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করলেই চলে না; এর ভিত্তি মজবুত করতে হয় তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে। চট্টগ্রাম যেভাবে রুগ্ণ কারখানাগুলোকে নতুন প্রাণের ছোঁয়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, ঠিক একই ধরনের সুদূরপ্রসারী নীতি যদি ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলের এসএমই খাতের জন্য গ্রহণ করা হয়, তবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আরও বেশি গতিশীল হবে।

সরকার, নীতির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনগুলো যদি এই বিষয়ে দ্রুত নজর দেয় এবং ঢাকার ছোট ফ্যাক্টরিগুলোর জন্য বিশেষ জোন বা স্থানান্তর নীতিমালা প্রণয়ন করে, তবে তা হবে দেশের বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তাদের জন্য এক ঐতিহাসিক আশীর্বাদ। আসুন, শিল্প বাঁচাই, অর্থনীতিকে শক্তিশালী করি।

তথ্য সংগ্রহ,

কাজী আবু বকর ব্যবস্থাপনা পরিচালক

করোনা ফ্যাশন লিমিটেড

সারাদেশ এর আরও খবর: